সর্বশেষ খবর
www.americanbangla.com

AMERICAN BANGLA – AB TV

আমেরিকান বাংলা টিভি

আমেরিকার জীবন, বাংলার সংযোগ

ভাঙা কাঁচের গ্লাস ও একটি অসম্পূর্ণ গল্প।

-তরিকুল ইসলাম মিঠু ।

নিউইয়র্ক শহরের মানুষগুলো সবসময় একটা অদ্ভুত তাড়ার মধ্যে থাকে। সকালবেলা সাবওয়ে স্টেশনে দাঁড়ালে মনে হয়, এই শহরের প্রত্যেকটা মানুষকে বিশেষ কোনো কম্পিউটার প্রোগ্রাম দিয়ে চালানো হচ্ছে। সেই প্রোগ্রামে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো অপশন নেই। শুধু একটা নির্দেশ আছে, দৌড়াও।

এখানে প্রায় সবাই দৌড়াচ্ছে। মনে হয়, এই বুঝি দেরি হয়ে গেল, এই বুঝি সব শেষ। অথচ একটা ট্রেন চলে গেলে কয়েক মিনিট পরই আরেকটা আসে। তারপরও মানুষ দৌড়ায়। এটা একটা মজার ব্যাপার। মানুষের দৌড়ানোর জন্য সবসময় কোনো কারণ লাগে না। একসময় দৌড়ানোটাই তার অভ্যাস হয়ে যায়। তখন কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, সেই প্রশ্নটা আর খুব গুরুত্বপূর্ণ থাকে না। সামনে সবাই দৌড়াচ্ছে, সেও দৌড়াচ্ছে।

সজীবও একসময় এই দৌড়ের মধ্যে ছিল। তবে তার দৌড়টা একটু অন্য রকম। অন্য সবাই যখন ট্রেন ধরতে ছুটত, সজীব ছুটত অন্য একটা জিনিসের পেছনে। অনেকটা নিজের ছায়ার পেছনে ছোটার মতো। জিনিসটার নাম সে নিজেও ঠিক জানত না। টাকা? সুখ? সফলতা? ভালো জীবন? হয়তো সবকিছু একটু একটু করে। মানুষ অনেক সময় জানে না সে আসলে কী খুঁজছে। শুধু জানে, কিছু একটা খুঁজে পেতেই হবে।

আমাদের দেশের মানুষের একটা মজার বিশ্বাস আছে। আমরা অনেকেই ভাবি, সমুদ্রের ওপারে বুঝি সুখের আলাদা কোনো দেশ আছে। আটলান্টিক পাড়ি দিলেই যেন নোনা পানির মধ্যে জীবনের পুরোনো কষ্টগুলো গলে যায়। আমেরিকার মাটিতে পা রাখলেই বুঝি নতুন সুখের জীবন শুরু। এখানে টাকা আছে, সুযোগ আছে, সুখ আছে। দুঃখগুলো বোধহয় ইমিগ্রেশন পার হতে পারে না।

বাস্তবে অবশ্য দুঃখের কোনো ভিসা লাগে না। মানুষ যেদিকে যায়, সুযোগ পেলে সেও সঙ্গে যায়।

সজীবও অনেকটা এই বিশ্বাস নিয়েই এসেছিল। তখন তার বয়স কম, বুকের ভেতর অনেক স্বপ্ন। আমেরিকা তার কাছে শুধু একটা দেশ ছিল না, ছিল স্বপ্ন পূরণের ঠিকানা। সে জানত না, সব স্বপ্ন ঘুম ভাঙার পরও সুন্দর থাকে না। কখনো কখনো স্বপ্নের মাঝখানে বাস্তব এসে দরজায় ধাক্কা দেয়। ঘুম ভেঙে যায়। স্বপ্নও একটু ভেঙে যায়।তারপরও মানুষ আবার ঘুমায়।আবার স্বপ্ন দেখে।মানুষের এই একটা দোষ আছে।অথবা হয়তো এটাই তার সবচেয়ে বড় গুণ।

নীলার সঙ্গে সজীবের বিয়ে হয়েছিল দেশে থাকতেই, খুব সাধারণ একটা পারিবারিক বিয়ে। তারপর দুজনে একসাথে পাড়ি দিয়েছিল আমেরিকায়। নতুন দেশ, নতুন জীবন, বুকের মধ্যে একরাশ আশা। প্রথমে উঠেছিল জ্যাকসন হাইটসের একটা ছোট্ট বেসমেন্ট ঘরে। বেসমেন্ট মানে মাটির নিচের ঘর, যেখানে জানালাটা থাকে একদম ফুটপাতের সমান উচ্চতায়। সেই জানালা দিয়ে শুধু মানুষের জুতো দেখা যেত, মুখ দেখা যেত না। সূর্যের আলো সেই ঘরে ঢুকতে ঢুকতে এত ক্লান্ত হয়ে পড়ত যে সকাল আর দুপুরের তফাত বোঝার জন্য দেয়ালের ঘড়ির দিকে তাকাতে হতো, সূর্যের দিকে তাকিয়ে কোনো লাভ ছিল না।

সজীব একদিন নীলাকে বলেছিল, “নীলা, এই জানালা দিয়ে মানুষ চেনার একটা থিওরি বানানো যায়। কালো জুতো পরা মানে অফিসের বড়কর্তা। সাদা স্নিকার্স মানে কলেজের ছাত্র। আর ওই যে একজোড়া লাল জুতো গেল, ওটা নিশ্চয়ই ভীষণ ব্যস্ত কেউ। তার হাঁটার গতি দেখেই বোঝা যাচ্ছে, পৃথিবী বাঁচানোর দায়িত্ব এখন ওর ওপর।”

নীলা তখন বাসন মাজতে মাজতে হেসে বলত, “তোমার মাথায় সারাক্ষণ এসব আজগুবি চিন্তা আসে কোত্থেকে, বলো তো? যাও তো, ময়লার ব্যাগটা একটু ফেলে এসো।”

সেই ছোট্ট বেসমেন্ট ঘরটার একটা নিজস্ব গন্ধ ছিল। সেই গন্ধের মধ্যে অভাব ছিল, কিন্তু অস্থিরতা ছিল না। অভাব আর দারিদ্র্য, এই দুটো শব্দ শুনতে প্রায় এক রকম, কিন্তু এদের মধ্যে অনেক তফাত। অভাব জিনিসটা থাকে পকেটে। আজ টাকা কম আছে, কাল বেশি হবে, এই বিশ্বাস নিয়ে মানুষ হাসিমুখে অভাবের সঙ্গে ঘর করতে পারে। কিন্তু দারিদ্র্য থাকে মনে। মনে একবার দারিদ্র্য ঢুকে গেলে পকেট ভর্তি টাকা থাকলেও মানুষ গরিব থেকে যায়। সজীব আর নীলার পকেট তখন প্রায় খালি ছিল, কিন্তু মনে কোনো দারিদ্র্য ছিল না।

পকেটে হয়তো একটা মাত্র বিশ ডলারের নোট থাকত, কিন্তু সেই নোটটা নিয়ে দুজন মানুষ একসাথে বাইরে বেরিয়ে এক কাপ কফি আর একটা সিঙ্গাড়া ভাগ করে খাওয়ার মধ্যে যে আনন্দ লুকিয়ে থাকত, সেই আনন্দ কোনো খুব দামী রেস্টুরেন্টের দামী দামী খাবারের মধ্যেও পাওয়া যাবেনা।

মানুষ বড় অদ্ভুত প্রাণী। পকেটে টাকা না থাকলে তার মনে হয়, টাকা থাকলেই বুঝি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আবার হাতে টাকা এলে অনেক সময় মনে হয়, টাকা দিয়ে পৃথিবীর সব ভাঙা জিনিসও বুঝি জোড়া লাগানো যাবে। এটা একটা বড় ভুল ধারণা। ব্যাংক একাউন্ট ভারী হতে পারে, কিন্তু সবসময় ভারী ব‍্যাংক একাউন্টই সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে না। মনের ব‍্যাংক যদি ধীরে ধীরে হালকা হতে থাকে একদিন একেবারে ফাঁকা হয়ে যেতে পারে, যদি মানুষ সময় থাকতে সেটা বুঝতে না পারে।

সজীব আর নীলার জীবনেও অনেকটা এমনই ঘটেছিল। বেসমেন্ট ছেড়ে তারা উঠে এল একটা ভালো অ্যাপার্টমেন্টে। গাড়ি হলো। গ্যারেজ হলো। ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যাগুলো বড় হতে লাগল। কিন্তু একই সময়ে একটা অদ্ভুত জিনিস ঘটতে লাগল, যেটা কেউ প্রথমে খেয়াল করেনি। তাদের কথা বলার পরিমাণটা ছোট হতে লাগল।

আগে সোফায় বসে যে কথা বলতে বলতে আধা ঘণ্টা কেটে যেত, সেই কথা ছোট হতে হতে একসময় মেসেজের ছোট্ট লাইনে এসে ঠেকল।

“রায়ানকে স্কুল থেকে কে আনবে?”

“তুমি।”

“আমার মিটিং আছে।”

“তাহলে আমি দেখব।”

ব্যাস, কথা শেষ। সংসারটা একটা ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন অফিস হয়ে গেল, যেখানে সব কাজ সময়মতো হয়, সব জিনিস গুছানো থাকে, কিন্তু একটা জিনিস সেখানে থাকে না, প্রাণ। একটা অফিসে প্রাণ না থাকলেও চলে, কাজ হয়ে যায়। কিন্তু একটা সংসারে প্রাণ না থাকলে সেটা শুধু ইট-কাঠের একটা বাক্স হয়ে দাঁড়ায়, যার ভেতরে দুটো মানুষ থাকে ঠিকই, কিন্তু একসাথে থেকেও যেন আলাদা বাস করে।

মানুষের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। নিজের ঘরের আলো যখন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে, তখন দূরের জানালার আলোও অনেক বেশি উজ্জ্বল মনে হয়। নিজের ঘরে কথা যখন কমে আসে, অভিমান যখন জমতে থাকে, তখন বাইরের কারও দুটো সাধারণ কথাও অকারণে খুব যত্নের মনে হয়। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে পুরোনো হিসাব থাকে না, পুরোনো অভিযোগ থাকে না, বাসি কোনো রাগ থাকে না। তাই অপরিচিত একজনের কাছে মনের দরজা খুলে দেওয়াটা অনেক সহজ মনে হয়।

একটা কমিউনিটি অনুষ্ঠানে প্রথম কথা হলো। হয়তো এর আগেও কোথাও দেখা হয়েছে, নীলার মনে নেই। আরমান অতি পরিচিতের মতো করে বলেছিল, “আপনাকে এর আগেও দেখেছি একা একা অনুষ্ঠান আসেন। ভাই আসেনি?” 

নীলা একটু কৃত্রিম হাসি দিয়ে জবাব দিলো “ না, ও একটা কাজে ব্যস্ত “

আরমান আরেক ধাপ এগিয়ে বলেছিল “আপনাকে আজকাল খুব ক্লান্ত দেখায়।”

কথাটা খুব সাধারণ। কিন্তু এই সাধারণ কথার ভেতরে একটা আশ্চর্য জাদু লুকিয়ে ছিল। অনেকদিন কেউ তাকে এভাবে খেয়াল করে কিছু বলেনি। সংসারে মানুষ অনেক কথা বলে, কিন্তু সব কথা শোনা হয় না। অনেক সময় একজন মানুষের সবচেয়ে বেশি দরকার হয় সমাধান নয়, শুধু কেউ তাকে দেখে বলুক, “তুমি কি ঠিক আছ?”

আরমানের কথাটা হয়তো ঠিক সেই জায়গাতেই গিয়ে লেগেছিল। নীলা অনেকদিন পর অনুভব করল, কেউ তার ক্লান্ত মুখটা খেয়াল করেছে।

শুরু হলো মেসেঞ্জারে কথা বলা। অক্ষর দিয়ে তৈরি একটা জগৎ, যেখানে কেউ কাউকে চোখে দেখে না, তবু মনে হয় খুব কাছের মানুষ। ধীরে ধীরে সজীবের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ল, আরমানের সঙ্গে দূরত্ব কমল। মেসেঞ্জারের কথাগুলো ধীরে ধীরে লম্বা হতে লাগল। শুরুতে ছিল অনুষ্ঠান, কাজ আর পরিচিত মানুষজনের কথা। পরে ঢুকে পড়ল ব্যক্তিগত কথা। তবে নীলা কখনো সজীবের সঙ্গে দুরত্ব বাড়ার বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলত না। কিন্তু কখনো কখনো “আজ কথা বলতে ইচ্ছা করছে না” বা “বাসায় থেকেও মাঝে মাঝে খুব একা লাগে” ধরনের বাক্য লিখে ফেলত।

আরমানও খুব বড় কোনো প্রতিশ্রুতি দিত না। শুধু উত্তর দিত।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, অনেক সময় মানুষ অন্য কারও সাথে কথা বলে কারণ তার প্রেমে পড়েছে এমন নয়, কখনো কখনো অন্য একজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েই প্রথম বুঝতে পারে, নিজের ঘরে কথা কমে গেছে, তাই হয়তো কথা বলার মানুষ খোঁজে। 

নীলার ক্ষেত্রেও হয়তো সেটাই হয়েছিল।

একটা সম্পর্ক যখন ভাঙতে শুরু করে, তখন সেটা একদিনে ভাঙে না। প্রথমে একটা সূক্ষ্ম ফাটল ধরে, চুলের মতো সরু, যেটা চোখে দেখা যায় না। কাঁচের গ্লাসের সুক্ষ ফাটলের মতো। মানুষ হয়তো তখনও সেই গ্লাসেই পানি খেতে থাকে, ভাবে সব ঠিক আছে। একদিন হঠাৎ দেখা যায়, গ্লাসটা আর আগের মতো নেই। সেই ফাটল দিয়েই পরে ভাঙন ঢুকে পড়েছে। 

একদিন রাতে রায়ান ঘুমিয়ে যাওয়ার পর নীলা কথাটা বলল। কোনো ভূমিকা ছাড়াই।

“আমি আর এভাবে থাকতে চাই না। আমি ডিভোর্স চাই।”সজীব কিছুক্ষণ নীলার দিকে তাকিয়ে রইল। যেন কথাটার অর্থ বুঝতে তার কয়েক সেকেন্ড বেশি সময় লাগল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “আরমানের জন্য?”

নীলা মাথা নাড়ল। “না। আরমানের জন্য না। ও না থাকলেও এই কথাটা হয়তো একদিন বলতে হতো।”

সজীব আর কিছু বলল না। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “কাল সকালে রায়ানকে স্কুলে কে নিয়ে যাবে?”

বড় কোনো আঘাত এলে মানুষের মাথা সবসময় বড় প্রশ্নের উত্তর খোঁজে না। অনেক সময় সে ছোট ছোট হিসাবের দিকে পালায়। কাল কে রান্না করবে, বিল কে দেবে, বাচ্চাকে স্কুলে কে নিয়ে যাবে। হয়তো মন তখনও বড় সত্যিটা একবারে মেনে নিতে পারে না। তাই আপাতত ছোট ছোট কাজের ভেতরেই নিজেকে লুকিয়ে রাখে।

এরপর শুরু হলো আইনি প্রক্রিয়া। কোর্ট, উকিল, কাগজপত্র। সজীব একদিন অফিসে বসে হিসাব করে দেখল, একসময় সে আট ডলার বাঁচানোর জন্য বাইরে কফি খেতে যেত না, বলত ঘরের কফিই তো অমৃত। আর এখন সেই সজীব আইনজীবীকে ঘণ্টায় চারশো ডলার দিচ্ছে। জীবন মাঝে মাঝে এমন একটা হিসাব সামনে এনে দাঁড় করায়, যা দেখে মাথা ঘুরে যায়। মানুষ ছোট ছোট জায়গায় সাশ্রয় করতে চায়, কিন্তু জীবনের বড় বড় জায়গায় সেই সাশ্রয়ের হিসাব কাজে লাগে না। জীবন তার নিজের দাম নিজেই ঠিক করে দেয় , কারো সঙ্গে আলোচনা করে না।

এই পুরো ঝড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল দশ বছরের ছোট্ট রায়ান। সে জানত তার স্কুলের কিছু বন্ধুর বাবা-মা আলাদা থাকে। কিন্তু নিজের বাবা-মাও একদিন দুটো আলাদা জায়গায় থাকবে, এটা সে কখনো ভাবেনি। তার মনে প্রশ্ন-তার বাবা-মা কেন আলাদা? সে কি কোনো ভুল করেছে? সে কি একটু বেশি দুষ্টুমি করে ফেলেছে কোথাও?

বাচ্চারা বড়দের ঝামেলার সবকিছু বোঝে না, কিন্তু তার প্রভাবটা ঠিকই টের পায়। অনেক সময় তারা এমন সব ঘটনার দায় নিজের ওপর নিয়ে নেয়, যার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কই নেই। বড়রা জানে সমস্যাটা আসলে কোথা থেকে এসেছে। কিন্তু বাচ্চারা জানে না। তাই তারা নিজের অজান্তেই নিজেদের দোষী ভাবতে শুরু করে।

একদিন রায়ান তার বাবাকে পিৎজার দোকানে বসে জিজ্ঞেস করেছিল, “ড্যাডি, তুমি কি মমিকে ঘৃণা করো?”

সজীবের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল। দশ বছরের একটা বাচ্চার মুখে “ঘৃণা” শব্দটা এত সহজে চলে আসে কী করে? বড়দের মধ্যে চলা অহংকার আর জেদের ধোঁয়া কীভাবে যেন ছোট্ট নিষ্পাপ মনেও ঢুকে পড়ে, কেউ চাইলেও সেটা পুরোপুরি আটকাতে পারে না।

সজীব একটু চুপ করে থেকে বলেছিল, “না বাবা। আমাদের মধ্যে কিছু বিষয়ে মতের মিল হয়নি, কিন্তু সে তোমার মা। তোমার মাকে আমি কখনো ঘৃণা করতে পারি না।”

রায়ান ছোট্ট একটা শব্দ বলেছিল। “গুড।”

রায়ানের বলা “গুড” শব্দটি সজীবের কানে বাজতে লাগলো। সেদিন রাতে সজীব নীলাকে একটা মেসেজ পাঠালো, “আমাদের মধ্যে যা হওয়ার হয়ে গেছে। কিন্তু রায়ানের সামনে আমরা কেউ কারও নামে খারাপ কথা বলব না। ওকে আমাদের ঝামেলার মাঝখানে টানব না।”

নীলা কিছুক্ষণ পর উত্তর দিয়েছিল, “ঠিক আছে।”

এখানে কোনো উকিল লাগেনি, কোনো আদালতের সিলমোহরও লাগেনি। দুটো মানুষের মধ্যে সামান্য একটু মনুষ্যত্ব বেঁচে থাকলে অনেক সমস্যার সমাধান শুধু একটা ছোট বাক্য দিয়েই হয়ে যায়।

সময় গড়িয়ে গেল। ডিভোর্স হয়ে গেল। কাগজে-কলমে সজীব আর নীলা আর স্বামী-স্ত্রী রইল না, হয়ে গেল রায়ানের বাবা আর মা। রায়ানের স্কুলের অনুষ্ঠানে দুজনেই যেত। জন্মদিনে কেক কাটার সময় রায়ান যখন একপাশে বাবা আর অন্যপাশে মাকে দেখত, তার মুখে যে হাসিটা ফুটে উঠত, সেই হাসির দাম পৃথিবীর কোনো মুদ্রা দিয়ে কেনা যেত না।

আজ দুই বছর পার হয়ে গেছে। নিউইয়র্কের এই শীতের বিকেলে রায়ানের স্কুলের অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে সজীব আর নীলা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হাসছিল। তাদের চোখে আগের সেই রাগ ছিল না। ছিল একটা অদ্ভুত প্রশান্তি, ঠিক যেন ঝড়ের পরে শান্ত হয়ে যাওয়া একটা নদী।

বিদায় নেওয়ার সময় নীলা পেছন থেকে ডেকেছিল, “সজীব?”

“বলো?”

“সাবধানে ড্রাইভ কোরো। রাস্তা বরফে পিচ্ছিল।”

সজীবের বুকটা একটু মোচড় দিয়ে উঠেছিল। সে ফিরে তাকায়নি, শুধু হাত উঁচিয়ে একটা ইশারা করেছিল। দরজাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল আস্তে করে, কিন্তু সেই শব্দে কোনো ভাঙার আওয়াজ ছিল না। ছিল একটা অদ্ভুত শান্তি, ঠিক যেমন লম্বা একটা ঝড়ের পর হঠাৎ আকাশ পরিষ্কার হয়ে যায়।

সজীব সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে পকেট থেকে গাড়ির চাবিটা বের করল। গাড়িতে গিয়ে বসার আগে সে একবার আকাশের দিকে তাকাল। অনেক দূরে একটা প্লেন কুইন্সের আকাশ দিয়ে মেঘ চিরে উড়ে যাচ্ছিল। প্লেনের লাল-নীল বাতিগুলো মিটমিট করে জ্বলছিল, অনেকটা অন্ধকারে পথ হারানো একটা জোনাকি পোকার মতো।

হয়তো সেই প্লেনের ভেতরে বসে কোনো তরুণ প্রথমবারের মতো আমেরিকায় আসছে। চোখে স্বপ্ন, বুকের ভেতর একটা অজানা উত্তেজনার ধুকপুক শব্দ। ঠিক যেমনটা একদিন সজীবেরও হয়েছিল। মানুষ যখন নিজের দেশ ছাড়ে, তখন সে শুধু একটা স্যুটকেস নিয়ে আসে না। সে সঙ্গে করে নিয়ে আসে একটা গোটা দেশ, মায়ের হাতের রান্নার গন্ধ, উঠানের ধুলো, ছোটবেলার রোদ।

সজীব কিছুক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে রইল প্লেনটার দিকে। তারপর আস্তে করে গাড়ির চাবি ঘুরিয়ে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল।

নিউইয়র্কের রাস্তায় তখনও হলুদ ট্যাক্সিগুলো পাগলের মতো ছুটছিল। হর্ন বাজছিল। মানুষ এমনভাবে দৌড়াচ্ছিল, দেখলে মনে হবে পাঁচ মিনিট পরে পৃথিবীর সব ট্রেন বন্ধ হয়ে যাবে, আর তাদের সবার টিকিট কেউ একজন কেটে নিয়ে যাবে।

সজীব গাড়ি চালাতে শুরু করল। কিন্তু আজ তার ভেতর কোনো তাড়া নেই।

মন্তব্য করুন